অমৃত আঙুর নিয়ে যাক আগামীর বাঙলায়

0



বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজ থেকে এখনো অনেক জীবন্ত। নগরায়নের দাপট থেকে কতদিন বাংলাদেশ নিজেকে রক্ষা করতে পারবে, আদৌ  পারবে কিনা, সেসব ভবিষ্যতের ব্যাপার। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের কবিতায় যেভাবে আবহমান গ্রাম তার নানা আবেগ, প্রথা, সংস্কৃতি, প্রবাদ, ভাষা নিয়ে উপস্থিত—এপারের বাংলা কবিতায় তা প্রায় উধাও। দূর জেলার কবিরাও পশ্চিমবঙ্গে প্রায়শই নগরের চেতনা , আঙ্গিক ও ভাষাতেই কবিতা রচনা করেন। ব্যতিক্রম যারা, তারা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে থাকেন। অর্থাৎ নগরের বিদ্বৎজনের সমাজ তেমন স্বীকৃতি দেন না মাটির কবিতাকে। এইটুকু ভূমিকা করতেই হল বাংলাদেশের নয় দশকের অগ্রগণ্য কবি শামীম রেজার কবিতা প্রসঙ্গে আসার আগে।

শামীম আমার বন্ধু, আমার আত্মার অংশ। পরস্পরের দুঃখী দিন সেই কবেই আমরা বদলাবদলি করেছি সীমান্তে। জীবনানন্দের ধানসিড়ি নদী থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, বোহেমিয়ান ছাত্রজীবন থেকে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক, উচ্ছ্বাসে ভরা তরুণ কবি থেকে কবিতার প্রশান্ত নিবেদক—পুরো জার্নিটাই আমার জানা। কাব্যগ্রন্থ থেকে কাব্যগ্রন্থে নানা বাঁক নিয়েছে শামীম, কিন্তু তার সারল্য অটুট। মহাবিশ্ব ও বরিশালকে সমচেতনায় সে ধরে রাখতে পারে তার কাব্যভাষায়। প্রিয়তম কাব্যগ্রন্থ ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ শামীমের আশ্চর্য কীর্তি, যেখানে আঞ্চলিক ভাষায় রূপসী বাংলা, প্রেম ও ইতিহাসচেতনাকে সে আবহমান গ্রামীণতায় উত্তীর্ণ করেছে।

‘যখন রাত্তির নাইমা আসে জ্বীনগাছের শিকড় ছায়ায়, সন্ধ্যাতারা ডোবে, শুকতারার মতন তুই কথা ক‌ও শিয়রের শিশুটির হাতে, উজাগরি রাত্তিরের খোঁপায় দেখি উপনিবেশ-ক্ষত শুইয়া আছে রক্তের ভিতরে, এখনো চিবায় শুধু, চিবাতে থাকে। চারিদিকে পাখিদের কান্নায় দোলনচাঁপার কামুক ঘ্রাণ বন্ধ হ‌ইয়া আসে; তারপর‌ও রাজহাঁসের কলরবে আউশের ক্ষেত রূপসাগরের পাড়ে অপরূপ দৃশ্য হওয়া নামে দোয়েলা নদীর ধারে।’

‘যখন রাত্তির নাইমা আসে হাড়গুঁজি পাতার কাঁটায়, আঁতুড় বংশীয় আমরা কেউ কেউ গুঁজাবকের ঠোঁটে বুইছামাছ হয়া ল‌ইড়া যাই মৃত্যুর ধাঁধায়।’

‘ভালবাসা উচ্চারণে ঘৃণা হয়, ময়লা ধরাইছে প্রাচ্যের সময়ে, তুমি প্রত্নমেয়ে হয়া প‌ইড়া আছো কোন এক রাজবংশীর খড়ের ডেরায়।’

‘আদিপুরুষের লাশ শুইয়া আছে বুকের ভেতর।’

‘এবার বর্ষায় বনবেড়ালের চোখে কান্না হয়া ঝরবে পরানি আমার।’

চর্যাপদ মনে পড়ে। ময়মনসিংহ গীতিকা মনে পড়ে। লালন মনে পড়ে। ইউরোপ থেকে ধার করা বিশ্বচেতনার পাশে আমাদের নিজস্ব লৌকিক বিশ্বের স্পন্দন যে আমাদেরকে ‘অপার’-এর স্বাদ দিতে পারে, শামীম তা চুপচাপ দেখিয়েছে। অথবা দেখায়নি, নিজে ‘হয়ে’ উঠেছে। ‘কবিতা সংগ্রহ’-এ শামীমের আরো ছয়টি কাব্যগ্রন্থ আছে—‘পাথরচিত্রে নদীকথা’, ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’, ‘ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল’, ‘শামীম রেজার কবিতা’, ‘হৃদয়লিপি’, ‘দেশহীন মানুষের দেশ’। প্রতিটি ব‌ইয়েই শামীম নিজেকে খুঁজেছে পাগলের মতো। আশ্রয় করেছে মিথ। আঁকড়ে ধরেছে প্রেম।

শামীমের কবিতাপাঠ আমি শুনেছি অনেক বার। আকুতি নিয়ে পড়ে। অদ্ভুত এক টানা সুর থাকে। তার সব কবিতার লিখিত রূপের ভেতর লীন হয়ে থাকে এই সরল, বেদনাতুর দৃষ্টি। বাক্যকে প্রয়োগচতুর করে তোলে না শামীম, নাগরিক সপ্রতিভতার (বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাচ্ছি না, ইংরেজিতে শব্দটি ‘স্মার্টনেস’) যা প্রিয় অঙ্গ! এমনকী ‘দেশহীন মানুষের দেশ’ কাব্যগ্রন্থে সরাসরি সমাজসচেতন কবিতাগুলিতেও শামীম সরল কান্না, সরল চিৎকার‌ই রেখেছে, নাটকীয় উচ্চারণপ্রবণ স্লোগান প্রসব করেনি। জলের দেশের কবি সর্বদাই জলের মতন‌ই ছলাৎছল।

‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যগ্রন্থের এক জায়গায় কবি লিখেছেন, ‘তবুও ফুরায়নি কৃষিচোখ যৈবনের অমৃত আঙুর।’ শামীমের কবিচোখ বাংলার কৃষিচোখ। তার কবিতা অমৃত আঙুর নিয়ে যাক আগামীর বাঙলায়।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here