আজকের জাটকা আগামী দিনের ইলিশ

0


জাতীয় মাছ ইলিশ আমাদের দেশের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। অনাদিকাল থেকেই আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষজাতীয় খাদ্য সরবরাহে এ মাছ অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বাঙালির দেশপ্রেম যতখানি, ইলিশপ্রেম তার চেয়ে কম নয়।

এ দেশে বাঙালির বর্ষবরণ থেকে শুরু করে ঘরোয়া অনুষ্ঠান যেমন ইলিশ ছাড়া হয় না, তেমনি ওপার বাংলায়ও জামাইষষ্ঠীতে ইলিশ লাগে। তাছাড়া সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ বাঙালিও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ইলিশ খেতে ভোলে না।

কিন্তু এত স্বাদের মাছটি দিন দিন হয়ে যাচ্ছে দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য। তাই ইলিশকে জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করতে সরকার দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে।

ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের গবেষণা ফলাফলের ভিত্তিতে দেশে ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের জন্য চিহ্নিত এলাকাগুলো হচ্ছে বরিশাল জেলার সদর ও হিজলা উপজেলার কালাবদর নদীর ১৩.১৪ বর্গকিলোমিটার, মেহেদিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার গজারিয়া ও মেঘনা নদীর যথাক্রমে ৩০ ও ২৭৪.৮৬ বর্গকিলোমিটার।

প্রস্তাবিত ষষ্ঠ অভয়াশ্রম এলাকার নদীগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৮২ কিমি. এবং আয়তন ৩১৮ বর্গকিলোমিটার। প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হলে এ এলাকায়ও মার্চ-এপ্রিলে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে।

ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকারের নানা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব কর্মসূচির আওতায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাটকাসমৃদ্ধ ১৭ জেলার ৮৫টি উপজেলায় জাটকা আহরণে বিরত ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭৪টি জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য মোট ৩৯ হাজার ৭৮৮ টন চাল প্রদান করা হয়েছে।

জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন ছাড়াও বিগত দুই অর্থবছরে মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন ২২ দিনের জন্য পরিবারপ্রতি ২০ কেজি হারে মোট ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪৬২টি পরিবারকে ১৪ হাজার ৮২৪ টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য মৎস্য অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়িত জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং গবেষণা প্রকল্পের আওতায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৩২ হাজার ৫০৯ জন সুফলভোগীকে জাটকা ও পরিপক্ব ইলিশ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন, ভ্যান/রিকশা চালানো, সেলাই মেশিন, ইলিশ ধরার জাল প্রদান, খাঁচাই মাছ চাষ ইত্যাদি আয়মূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

তাছাড়া প্রকৃত মৎস্যজীবী ও জেলেদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে মৎস্য অধিদফতর থেকে ইতিমধ্যে ১৬ লাখ ২০ হাজার মৎস্যজীবী ও জেলেদের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৪ লাখ ২০ হাজার জেলের মাঝে পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে মোট মাছ উৎপাদনেও বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন হয়েছে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন, ইলিশ উৎপাদন ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। দেশে মৎস্য উৎপাদনে ইলিশ মাছের অবদান ১২ শতাংশ, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান বর্তমানে ১ শতাংশ। দেশের মোট উৎপাদনে মৎস্য চাষের অবদান ৫৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত ১০ বছরে মৎস্য খাতে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

এভাবে উৎপাদন হলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী ২০২২ সালে মাছে বাংলাদেশ বিশ্বে এক নম্বর অবস্থানে পৌঁছবে বলে জানিয়েছেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক ড. কৃষ্ণা গায়েন।

বিগত বছরে ইলিশ উৎপাদনের সফলতা জেলে সম্প্রদায়ের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। জেলেরা অনেকেই এখন বুঝতে পারছে, জাটকা ও মা ইলিশ সঠিকভাবে সুরক্ষা করতে পারলে বর্ধিত হারে ইলিশ উৎপাদনের সুফল তারা নিজেরাই ভোগ করতে পারবে।

এ জন্য জেলেরাও অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হয়ে জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করছে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে এটি একটি ইতিবাচক দিক। তাছাড়া সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে তথ্য উঠে এসেছে, মৎস্য খাতে ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।

এ খাতে গত ১০ বছরে গড়ে বার্ষিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৬ লাখ মানুষের। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।

মো. সামছুল আলম : গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতর

[email protected]



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here