একুশ শতকের বিশ্ব অর্থনীতি সূচকে এশিয়াই শীর্ষে: ড. বারকাত

0


অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেছেন, এশিয়ার কেন্দ্রীয় অর্থনীতি ক্রাইম ইকোনমি।তবে আগামী শতাব্দীর অর্থনীতিতে এশিয়া সম্ভাবনাময়। এশিয়া হবে মৌলিক অর্থনীতির সূচকে প্রথম। আর এর সঙ্গে হিউম্যান ট্রাফিকিং, স্মাগলিং, হুন্ডি ও সাইবার ক্রাইমসহ অন্যান্য দুর্নীতি থাকবে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে।

শুক্রবার (১৫ মার্চ) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দুদিন ব্যাপী ‘দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্র এবং সমাজ: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনের প্ল্যানারি সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের আয়োজন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ ও ভারতের কলকাতার ‘মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ।

অধ্যাপক বারকাত বলেন, ‘আমার মতে, গ্লোবাল অর্থনীতির সূচকে চীনের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় (রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে),  দ্বিতীয় হচ্ছে ইউএস, তৃতীয় ভারত এবং চতুর্থ জাপান। আর গত ১০ থেকে ১৫ বছরে ২০২১ সেঞ্চুরি-ই এশিয়ার সেঞ্চুরি। এশিয়াকে ল্যান্ডস্কেপ করলে পলিটিক্যাল ডেমোক্রেসিতে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ রয়েছে। এককেন্দ্রিক শক্তিতে উত্তরে রয়েছে চীন, কোরিয়া ও জাপান। মিলিটারি কনফ্লিক্টে রয়েছে থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া।’

‘বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন ও ভারত এশিয়ার মধ্যে সামরিক ও ব্যবসায়িক শক্তি হিসেবে বিদ্যমান থাকবে’ বলে মন্তব্য করেন আবুল বারকাত।

বিশ্ব সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে চীন ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, আর  এতে হিউম্যান ট্রাফিকিং, স্মগলিং, হুন্ডি ও সাইবার ক্রাইম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে। 

গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের অগ্রগতি ও সম্ভবাবনার কথা উল্লেখ করে আবুল বারকাত বলেন, ‘গত ৫০ বছরে ভারতের অর্থনীতির গতি চীনের চেয়ে এগিয়ে।’ তবে ভারতের সামাজিক সংকট ও সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।

চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বড় ধরনের বাজেট ঘাটতির কারণে এসব দেশের অর্থনীতিতে প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে বলেও জানান ড. বারকাত।

এশিয়ার উন্নয়নের সম্ভাবনার কথা বললেও এই অর্থনীতিবিদ প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘গণতান্ত্রিক মৌলিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। ফর দ্য পিপল হচ্ছে ফার (Far) দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল হচ্ছে গুড বাই পিপল এবং অফ দ্য পিপল হচ্ছে ‘ওএফএফ’ (OFF)।”

এর আগে শুক্রবার সকালে প্রধান অতিথি  হিসেবে সেমিনারের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যারা ইতিহাস পড়েন না, তারা মূলত শিকড়বিহীন প্রজন্ম। রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে জানতে হলে ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধ্বংসাত্মক সবকিছু থেকে উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু, বঙ্গবন্ধু নিজস্ব জনশক্তি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন— দেশ একদিন এগিয়ে যাবেই। বর্তমানে  যেকোনও দুর্যোগে অন্যদেশ থেকে সাহায্য পাঠাবে— এই আকাঙ্ক্ষায় তীর্থের কাকের মতো বাংলাদেশের এখন আর  অপেক্ষা করতে হয় না।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা যত নতুন কিছুর সঙ্গে পরিচিত  হচ্ছি, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, এগুলোর ব্যাপ্তি আগেও ছিল। কোনও জাতির সঠিক উৎস ও অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে ইতিহাস গবেষণার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।’

উদ্বোধনী সেশনে কি-নোট উপস্থাপন করেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কাউন্সিল ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (নতুন দিল্লি)-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মুচকুন্দ দুবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য  অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সম্মেলনের সমন্বয়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম এবং ধন্যবাদ বক্তব্য দেন ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোদেজা খাতুন।

উল্লেখ্য, দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও শিক্ষকের প্রায় ৬৪টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হবে।

প্রথম দিনে প্ল্যানারি সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের  সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ভারতের নতুন দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজের অধ্যাপক ড. সুচিত্রা মাহাজন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আফসান চৌধুরী এবং জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কে ভারদোয়াজ।

বিকালে টেকনিক্যাল সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ আব্দুল্লাহ জামালের সভাপতিত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সেমিনারে ৯টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।

দ্বিতীয় টেকনিক্যাল সেশনে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মোট আটটি  প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।

তৃতীয় টেকনিক্যাল সেশনে ভারতের জয়দেবপুর ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রূপ কুমার বর্মনের সভাপতিত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আটটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।

এছাড়া, চতুর্থ টেকনিক্যাল সেশনে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. কে. এম. মহসিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সাতটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়।

শনিবার দ্বিতীয় দিনে সকাল ১০টা থেকে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হবে। এতে একটি প্ল্যানারি সেশন, টেকনিক্যাল সেশন ও সমাপনী অনুষ্ঠান কার্যক্রম থাকবে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here