‘নো টেনশন, আমিই হব দ্বিতীয় এরশাদ শিকদার’

0


চকবাজারের বকশীবাজার মোড়ে বক্সার গ্রুপের প্রধান বক্সারকে কল করে ডেকে এনে ছুরিকাঘাতের পর একটি অটোরিকশায় পুটলা সিফাত, ইমন, মিলন, মুন্না ও ইয়াসিন বাংলাদোয়ারে যায়।

সেখানে পুটলা সিফাতের বাসায় তারা রাত যাপন করে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সিফাত বাথরুমে ঢুকে গোসল করে। এরপর সাউন্ড বক্সে গান ছাড়ে- ‘আমি তো মরেই যাব, চলে যাব, রেখে যাব সবি/ আছসনি কেউ সঙ্গের সাথী, সঙ্গেনি কেউ যাবি / আমি মরে যাব…’। সুরে সুরে নিজেও গানটি গায়।

পুটলা সিফাত তখন আমাদের বলছিল, এরশাদ শিকদার নেইতো কি হয়েছে। নো টেনশন! আমিই হব দ্বিতীয় এরশাদ শিকদার। এরশাদ শিকদার কাউকে খুনের পর এ গানটিই গাইতেন। আমিই হব তার উত্তরসূরি। বক্সার খুনের ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে ইমন ও মুন্না এমন তথ্য দিয়েছে পিবিআইকে।

পিবিআই ঢাকা মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, ৭ মার্চ রাতে বকশীবাজার মোড়ে কিশোর বক্সার খুনের ঘটনায় ৮ মার্চ চকবাজার থানায় একটি মামলা হয়।

মামলাটি ক্লুলেস হওয়ায় পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এর তদন্ত শুরু করে পিবিআই। ঘটনার ৪ দিনের মাথায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হয় পিবিআই।

পিবিআইর এসআই আলআমিন শেখ যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে নেমে বক্সার গ্যাংয়ের প্রধান বক্সার খুনের মূল আসামি ইমনকে ১১ মার্চ সোয়া ১১টায় কক্সবাজার জেলা সদরের লাইট হাউস প্রধান সড়ক হতে এবং ১২ মার্চ সকালে মুন্না মিয়াকে ঢাকার বংশাল থানাধীন বাংলাদোয়ার এলাকা হতে আটক করি।

জিজ্ঞাসাবাদে এরা বক্সার খুনের ঘটনা স্বীকার করে এ চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি দেয়। এছাড়াও এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও নানা তথ্য দিয়েছে ইমন ও মুন্না। ১৩ মার্চ ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে তারা।

ইমন আদালতে তার স্বীকারোক্তিতে জানায়, হোসেন ও বক্সার মিলে প্রায় দেড় মাস আগে পুটলা সিফাতকে ছুরিকাঘাত করে। আমরা সিফাতকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করাই। এরপর আমি রাতে বক্সারকে ফোন দেই। বলি তোমার সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তবে হোসেনকে মারব।

বক্সার বলে সমস্যা নাই তোমরা আসো। আমরা বক্সারের এলাকায় গিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করি কিভাবে হোসেনকে আমরা মারব। আমরা এলাকায় চলে এসে সিফাতের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে সিফাত বক্সার আমাদের গোপন কথা হোসেনের কাছে বলে দিতে পারে। তখন আমরা বলি, এটা পরে দেখা যাবে।

হোসেন নবাবপুরের একটি দোকানে কাজ করে। তার সঙ্গে আমার দেখা হলে হোসেন বলে, কিরে আমাকে মারার পরিকল্পনা করছিস? আমি কোনো কথা না বলে চলে আসি। এরপর রাতে আমি সিফাতের কাছে যাই। এরপর আমি মিলন, পুটলা সিফাত, মুন্না ও ইয়াসিন মিলে বক্সারের এলাকায় (বকশীবাজার) যাই।

আমরা তাকে ফোন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ডেকে আনি। বক্সার বলে চল ক্লাবের দিকে যাই। যাওয়ার পথে অন্ধকার রাস্তায় আমি (ইমন) বক্সারের কাঁধে পাড় (আঘাত) দেই। এ সময় আমারও হাত কেটে যায়। সিফাত তার হাতে থাকা চাকু নিয়ে মুন্নাকে বলে শালাকে ধর। মুন্না ল্যাং মেরে বক্সারকে ফেলে দেয়।

বক্সার রাস্তায় পড়ে গেলে মিলন তার হাতে থাকা চাকু দিয়ে বক্সারের পিঠে আঘাত করে। আমরা বক্সারকে ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যাই। ওই দুটি চাকু ও পাঞ্জ (গিয়ার চাকু) পুটলা সিফাতের কাছে রাখি।

আমরা একটি অটোরিকশায় বাংলাদোয়ার এলাকায় পুটলা সিফাতের বাসায় যাই। সিফাতের বাসায় সারা রাত গান শুনে কাটাই। এরপর সকালে সিফাত আমাদের বলে তোরা যে যার মতো পালিয়ে যা। এরপর আমি কক্সবাজার চলে যাই।

মুন্না আদালতের কাছে তার জবানবন্দিতে একইভাবে বক্সার হত্যার স্বীকারোক্তি দেয়। সে বলে, ঘটনার দিন পুটলা সিফাত আমাকে (মুন্না) ডেকে বলে শহীদ মিনারে যেতে হবে। আমি (মুন্না) ইমন, মিলন, সিফাত ও ইয়াছিন মিলে শহীদ মিনারে যাই। মিলন, সিফাত ও ইমন মিলে বক্সারকে ডেকে এনে কথা বলে।

একটি গলির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অন্ধকার পেয়ে ইমন চাকু দিয়ে বক্সারকে আঘাত করে। এরপর সিফাত চাকু দিয়ে বক্সারকে পাড় দেয়। বক্সার পালাতে চাইলে মিলন ইমনের হাতে থাকা চাকু দিয়ে আমাকে (মুন্না) বলে ধর। আমি পা দিয়ে বক্সারকে ল্যাং মারি। মিলন তখন চাকু দিয়ে বক্সারের পিঠে আঘাত করে।

এরপর আমরা পালিয়ে গিয়ে সিফাতের বাসায় রাত কাটাই। পরের দিন সকালে উঠে দেখি যে কেউ নেই। এরপর আমি সকালে বাসায় চলে যাই।

এ ঘটনায় আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছে তাদেরই বন্ধু রাসেল ও ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। রাসেল আদালতকে জানায়, ইমন তার বন্ধু। যেদিন ইমনরা বক্সারকে খুন করে সেদিন রাতে আমি (রাসেল), হৃদয়, ওমর, রাসেল মিলে কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়ার উদ্দেশে গাড়িতে ছিলাম। আমরা কক্সবাজার চলে যাই।

পরেরদিন শুক্রবার বিকালে মিলন আমাকে মেসেঞ্জারে জানায়, বক্সার মারা গেছে। আমি বলি কিভাবে মারা গেছে? তখন মিলন আমাকে বলে ৭ মার্চ রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে সে (মিলন), ইমন সিফাত, মুন্না ও ইয়াসিন মিলে বক্সারকে ডেকে এনে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এর পরের দিন সকালে ইমন আমাকে ফোনে জানায়, সে কক্সবাজারে আসছে।

তখন আমি ইমনের সঙ্গে দেখা করে বক্সারের কথা জিজ্ঞেস করি। ইমন আমাকে ৭ মার্চ রাতে বক্সারকে ফোন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দক্ষিণে ১৪নং বকশীবাজার রোডে ডেকে এনে ছুরিকাঘাতে হত্যার কথা জানায়।

আদালতের কাছে ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ তার জবানবন্দিতে জানায়, ৬ মার্চ রাতে ইমন আমাকে (ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ) বলে বক্সারকে মারতে যাব, তুই আমাদের সঙ্গে যাবি। আমি বলি, দেখি পরে জানাব। পরদিন ৭ মার্চ বিকালে ইমন আমাকে ফোন দিয়ে বলে, আনন্দবাজার যাব, যাবি?

তখন ও আমাকে বলে বক্সারের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। আমার কাজ থাকায় তার সঙ্গে যেতে পারিনি। ৮ মার্চ শুক্রবার সকালে আমি বাসা থেকে বের হয়ে সুরিটোলা স্কুলের মাঠের দিকে যাই।

গিয়ে দেখি সুমন, সানাউল্লাহ, সাহাবুদ্দিন, ইমন, ল্যাংটা, পুটলা সিফাত সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলে সিফাত আমাকে বলে বক্সারকে দিয়া দিছি। কে কে গেছিলি জানতে চাইলে সিফাত আমাকে জানায়- ইমন, আমি (সিফাত), মুন্না, ইয়াসিন, মিলন মিলে গিয়েছিলাম। পরে আমি বলি কাজটা ঠিক করিস নাই।

তখন ইমন আমাকে বলে সে বাসা থেকে বাইরে চলে যাবে। কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করলে ইমন আমাকে জানায়, রাসেলের দেশের বাড়ি যাবে।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বক্সার খুনে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পিবিআই।

তিনি বলেন, পুরান ঢাকায় বেশ কয়েকটি গ্যাং গড়ে উঠেছে। দুই ধরনের গ্যাং আছে। একটি সিনিয়র গ্যাং, অপরটি জুনিয়র গ্যাং। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এরা হানাহানি-খুনাখুনি করছে। তিনি বলেন, এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দিনে দিনে এরা দুর্ধর্ষ হয়ে উঠবে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here