বঙ্গবন্ধুর খুনির নাম-পরিচয় বদল

0


বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন নিজের নাম-পরিচয় বদলে ফেলেছেন। তার নতুন নাম রাখা হয়েছে রফিকুল ইসলাম খান।

নতুন এ নাম যুক্ত করেই তার পরিবারের সব সদস্য জাতীয় পরিচয়পত্র পান। এমনকি খুনি পিতার নাম বদলে তার সন্তানরা নানা প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য করছেন নির্বিঘ্নে। দিব্যি ঘুরছেন দেশ-বিদেশেও। যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীদের দলে ছিলেন অগ্রভাগে। শুধু তাই নয়, ঠাণ্ডা মাথার এ খুনি জেলহত্যা মামলারও আসামি।

যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মোসলেম উদ্দিনের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে সবকিছু ঠিক থাকলেও শুধু পিতার নাম বদল করা হয়েছে। মোসলেম উদ্দিনের নামের জায়গায় লেখা হয়েছে রফিকুল ইসলাম খান। এ সংক্রান্ত সব প্রমাণপত্র যুগান্তরের হাতে সংরক্ষিত আছে।

জানা যায়, মোসলেম উদ্দিন ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর নরসিংদী জেলার শিবপুরের দত্তেরগাঁও এলাকায় বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। ’৯৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো সরকারই মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি।

এমনকি বিএনপি সরকারের সময় তার বাড়িতে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা থাকত। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হলে তার বাড়িসহ বেশকিছু সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়। একপর্যায়ে খুনি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন পালিয়ে যান। তার পরিবারের সদস্যরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। অনেকেই নিরাপদ স্থানে গা ঢাকা দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কয়েক বছর পর তাদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে।

এ সুযোগে মোসলেম উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা ফের নরসিংদী এলাকায় ফিরে আসেন। কিন্তু এবার মোসলেম উদ্দিনের ৫ ছেলে ও এক মেয়ের সবাই কৌশলে পিতার নাম বদলে নিতে সক্ষম হন। জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে সরকারি সব ধরনের কাগজপত্রে তাদের পিতার নাম হয়ে যায় রফিকুল ইসলাম খান।

নতুন পরিচয়ে তারা সমাজের মূল ধারায় মিশে যান খুব সহজে। চাকরি ও ব্যবসা- বাণিজ্য শুরু করেন নতুন করে। মোসলেম উদ্দিনের বড় ছেলে সাজিদুল ইসলাম খান নরসিংদী শহরের টাউন হল মোড়ে হোটেল ব্যবসা করছেন। ২য় পুত্র শফিকুল ইসলাম খান চাকরি নেন জেনারেল ফার্সাসিটিক্যালস কোম্পানিতে।

৩য় ছেলে মাহমুদুল ইসলাম খান সিনিয়র আরএসম পদে চাকরি পান অ্যালকো ফার্মাসিটিক্যালসে। ৪র্থ পুত্র মজিদুল ইসলাম খান পরিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনা করেন এবং পঞ্চম পুত্র মহিদুল ইসলাম খান নদী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন উঁচু পদে। মোসলেম উদ্দিনের একমাত্র মেয়ে সানাজ খানের বিয়ে হয় নরসিংদীতেই।

তার স্বামী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এখন দক্ষিণ কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

সরেজমিন নরসিংদী : মোসলেম উদ্দিনের বড় ছেলে সাজিদুল ইসলাম খানের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা লেখা- গ্রামের নাম টাওয়াদী, চিনিসপুর ইউনিয়ন, জেলা নরসিংদী। এ ঠিকানা ধরে ১২ ফেব্রুয়ারি সেখানে হাজির যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম। গ্রামে ঢোকার মুখে যে এলাকাটি পড়ে তার নাম দাসপাড়া।

মহল্লার খোলা মাঠে একদল কিশোর-যুবকের আড্ডা চলছে। যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম তাদের কাছে গিয়ে জানতে চায় রফিকুল ইসলাম খানের ছেলে সাজিদুল ইসলামের বাড়িটা কোন দিকে? কিন্তু না, এ নামে কাউকে চিনতে পারছে না তারা। স্থানীয় আরও কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। তারাও বললেন, এ নামে কেউ এ এলাকায় থাকেন না।

এবার তাই ঠিকানা যাচাইয়ে চিনিসপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের দিকে রওনা হয় যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম। কিছুদূর যেতেই দেখা হয় ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুমন আহমেদের সঙ্গে।

তিনিও প্রথমে রফিকুল ইসলামের ছেলে সাজিদুল ইসলাম নামে কাউকে চিনতে পারলেন না। এবার তাকে সাজিদুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানো হয়। পরিচয়পত্রের সাদা-কালো এবং অস্পষ্ট ছবিটি দেখেও অনেকটা লাফিয়ে ওঠেন সুমন আহমেদ। ছবির ব্যক্তিকে চিনতে এক মুহূর্ত দেরি হয়নি তার। বলেন, এটা তো বঙ্গবন্ধুর খুনি মোসলেম উদ্দিনের ছেলে সাজিদুল।

তার বাবার নাম রফিকুল ইসলাম কিভাবে হল? ইউপি সদস্য সুমন আহমেদ বলেন, তারা কি জাতীয় পরিচয়পত্র বদলে ফেলেছে? যদি করে থাকে তবে তো ইউনিয়ন পরিষদের কিছুই করার নেই। কারণ জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ আছে।

তিনি আরও বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চারিত্রিক সনদ, নাগরিকত্ব সনদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাগজপত্র মূলত জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতেই দেয়া হয়। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রে মোসলেম উদ্দিনের নাম বদলে গেলে অন্যসব কাগজপত্র বদলে যাবে এটাই স্বাভাবিক।

স্থানীয়দের কাছে খবর নিয়ে যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম হাজির হয় নরসিংদী সদরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাড়িতে। বাড়ির গেটে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া নম্বর প্লেট লাগানো। এতে বড় করে লেখা- চিনিসপুর ইউনিয়ন পরিষদ, মালিকের নাম- সাজিদুল ইসলাম খান।

সীমানা প্রাচীর ঘেরা একতলা বাড়ি। লোহার গেটে কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন শক্তপোক্ত এক যুবক। নিজের নাম বললেন মজিদুল ইসলাম খান।

তার সঙ্গে যুগান্তরের কথোপকথন ছিল নিম্নরূপ-

যুগান্তর : এটা আপনার বাড়ি?

মজিদুল : জি? কিন্তু আপনারা কে? কোথা থেকে এসেছেন?

যুগান্তর : আমরা সাংবাদিক, ঢাকা থেকে এসেছি। আচ্ছা, আপনার পিতার নাম কি?

মজিদুল : আমার পিতার নাম রফিকুল ইসলাম খান। কেন বলুন তো?

যুগান্তর : কিন্তু আমরা তো জানি আপনি রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে।

মজিদুল : ওটা আমরা জানি না।

যুগান্তর : আপনার বাবা তো বঙ্গবন্ধুর খুনি, এটা জানেন নিশ্চয়?

মজিদুল : না, আমরা সেসব কিছুই জানি না। কারণ আমরা তখন অনেক ছোট ছিলাম। পরে পত্র-পত্রিকায় দেখেছি।

যুগান্তর : আপনার বাবার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়?

মজিদুল : না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এসে এ প্রশ্ন আমাদের অনেকবারই করেছে। আমরা বলেছি কোনো যোগাযোগ নেই। ’৯৬ সালের পর থেকে তিনি নিরুদ্দেশ। আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই।

যুগান্তর : পিতার বর্বরতম এ অপরাধ নিয়ে আপনাদের পরিবারের প্রতিক্রিয়া কী?

মজিদুল : ওটা যদি (বঙ্গবন্ধুর খুন) উনি করে থাকেন তবে অবশ্যই খারাপ কাজ করেছেন। তবে বিষয়টা আমার বড় ভাই সাজিদুল ইসলাম ভালো জানেন। সেদিন কি হয়েছিল উনি বলতে পারবেন।

মজিদুল দেখিয়ে দেন শহরের টাউন হল মোড়ে কাঁচালংকা নামের একটি হোটেল চালান তার বড় ভাই। সেখানে গেলে তাকে পাওয়া যাবে।

দুপুর ২টায় যুগান্তর অনুসন্ধান টিম কাঁচালংকা রেস্টুরেন্টের সামনে হাজির হয়। সাইনবোর্ডে শুধু লেখা কাঁচালংকা কাবাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। সেখানে প্রোপাইটরের নাম নেই। রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে বসা মোসলেম উদ্দিনের বড় ছেলে সাজিদুল ইসলাম খান। জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দেখিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় আপনার পিতার নামের জায়গায় লেখা রফিকুল ইসলাম খান আসলে কে। তিনি দাবি করেন, মোসলেম উদ্দিনেরই আরেক নাম রফিকুল ইসলাম খান।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুনের পর ইতিহাসের পাতা থেকে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড মুছে ফেলার কত বড় চেষ্টা হয়েছিল তার জ্বলন্ত প্রমাণ মেলে সাজিদুলের জবানিতেই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বলছেন, ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়েন। তাই সবকিছু তার মনে নেই। তাছাড়া বড় হয়েও এসব বিষয়ে তারা তেমন কোনো কিছু জানতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘ওই (বঙ্গবন্ধু) খুনের বিষয়টি আমরা তেমন একটা জানতাম না। আব্বা-আম্মাও বিষয়টা আমাদের কিছু বলেননি। আমরা এ গ্রামেই বসবাস করেছি। কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। তখনই প্রথম আমরা শুনলাম আব্বার নামে এরকম (বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা) একটা মামলা আছে। এরপরই নানা ধরনের খোঁজখবর শুরু হয়।

মূলত তখনই আব্বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর আমাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।’ তিনি জানান, এখন মোসলেম উদ্দিনের বয়স কমবেশি ৯০ বছর হবে। তার কথাতেই স্পষ্ট হয়, ’৯৬ সালের আগ পর্যন্ত জাতির পিতা খুনের বিষয়টি গোপনই ছিল। এ নিয়ে তাদের কোনোদিনই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়নি। এমনকি তাদের বাড়িতে পুলিশি প্রহরা থাকত বাড়তি নিরাপত্তার জন্য।

মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ আছে বলে ধারণা দেশের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। মোসলেম উদ্দিন ভারতে আত্মগোপন করে থাকার ব্যপারেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর‌্যাবেক্ষণ রয়েছে।

মোসলেম উদ্দিন খানের একমাত্র মেয়ে সানাজ খানকে বিয়ে করেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া নামের স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক। তিনি এখন শিবপুরের কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

তার অফিস কক্ষের দেয়ালে একটি ছবি বাঁধানো। ছবিতে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইনের পাশে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছেন।

মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা বলতে তার স্কুলে হাজির হয় যুগান্তর অনুসন্ধান টিম। দুপুর দেড়টা। স্কুলে তখন পরীক্ষা চলছে। স্কুলের বারান্দায় পায়চারি করছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। সেখানেই তার সঙ্গে কথা হয়। তার কাছে যুগান্তর প্রতিবেদকের সরাসরি প্রথম প্রশ্ন, আপনার শ্বশুরের নাম কি?

তিনি অকপটে বলেন, আমার শ্বশুরের নাম রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। তবে আপনার স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রে রফিকুল ইসলাম খান কিভাবে লেখা হল? এবার তিনি হকচকিয়ে গেলেন।

বললেন, ‘এটা আমি বলতে পারব না। বঙ্গবন্ধুর খুনের কথা মনে পড়ে আপনার? তিনি বলেন, আমি ’৯২ সালে বিয়ে করেছি। তখন আমার শ্বশুর এ গ্রামেই ছিলেন। তবে তখন এত বিস্তারিত জানতাম না। পরে কিছু কিছু জেনেছি।’ কথাবার্তার একপর্যায়ে বিস্ময়করভাবে তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী বলে দাবি করেন।

বললেন, ছাত্রজীবন থেকেই আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। শেখ হাসিনা যখন প্রথম দেশে ফিরে আসেন তখন আমরা ঢাকায় তাকে দেখতেও গিয়েছিলাম। ’৯৬-এর পরে শুনলাম, আমার শ্বশুর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অন্যতম। শুনেছি বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here