বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারে রেডি ছিল ‘কল-রেডী’

0


কল-রেডী খুঁজে পেতে কোনও ঝামেলা হলো না। মঙ্গলবার (৫ মার্চ) দুপুরে ঢাকার গুলিস্তানে রিকশাচালককে লক্ষ্মীবাজারের হৃষিকেশ দাশ রোড বলতেই বললেন, ‘ওঠেন।’ হৃষিকেশ দাস রোডে পৌঁছে বয়স্ক রিকশাচালক জানতে চাইলেন, ‘এবার কোথায় যাবেন?’ কল-রেডীর কথা উল্লেখ করা মাত্রই তিনি বললেন, ‘মাইকের দোকান?’ প্রাসঙ্গিক আর কোনও তথ্য জানানোর দরকার হলো না; পৌঁছে গেলাম ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করা কল-রেডীতে।

কল-রেডী, সাধারণ এক মাইকের দোকান হলেও অসাধারণ তার অর্জন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করে কল-রেডীও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। সেই ইতিহাসের খুঁটিনাটি জানতে প্রতিষ্ঠানটিতে যাওয়া। কল-রেডীর বর্তমান মালিকরা খুব একটা কথা বলতে আগ্রহী না। এই প্রতিবেদক যখন প্রতিষ্ঠানটিতে যান তখন সেখানে ছিলেন কল-রেডীর পরিচালক সাগর ঘোষ। তিনি বললেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে ৭ মার্চের আগে সাংবাদিকরা আসেন, তথ্য নিয়ে যান। খবর প্রচার করেন। ওই পর্যন্তই।’ একটু দম নিলেন, ছাড়লেন দীর্ঘশ্বাস। তার প্রতিটি কথা ছিল অভিমানমাখা।

সাগর ঘোষের কাছ থেকে জানা গেল, তার বাবা-কাকারা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু-বুলেট উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর টানে রাতের আঁধারে রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগিয়েছিলেন। ৭ মার্চ সকালেও মাইক লাগানো হয়। কিন্তু সেই কাজের কোনও স্বীকৃতি তার বাবা-কাকারা পাননি। তিনি ও তার পরিবার খুব আশা করেছিলেন, বাবা-কাকাদের যে কেউ জীবিত থাকতেই স্বীকৃতি পাবেন। কিন্তু তা হয়নি। সাগর ঘোষের বাবা-কাকাদের মধ্যে সর্বশেষ সদস্য কানাই ঘোষও দুই বছর আগে মারা গেছেন। এখন আর এসব নিয়ে তাদের কথা বলতে ভালো লাগে না উল্লেখ করলেও তিনি শেষে জানালেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের জন্য কল-রেডীই সবার আগে রেডি ছিল।

কল-রেডীর পরিচালক সাগর ঘোষ ৭ মার্চের আগের রাতে এবং ওইদিনের ঘটনার কথা তার বাবা-কাকাদের কাছে শুনেছেন। কথোপকথনের সেসব স্মৃতি থেকে তিনি জানালেন, কল-রেডীর আদি মালিকদের মধ্যে একজন তার কাকা কানাই ঘোষ। ১৯৭১ সালে কানাই ঘোষের বয়স ছিল ১৭-১৮ বছর। ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার হয়েছিল কানাই ঘোষ আর তার দুই ভাইয়ের লাগানো মাইকে। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আশেপাশে থাকার পরও জনসভার আগের দিন ৬ মার্চ কানাই ঘোষ তার অন্য দুই ভাইকে নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগাতে যান। ৭ মার্চ অনেক ঝুঁকি সত্ত্বেও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে মাইক লাগিয়েছেন তিনি। ‘বলতে গেলে একপ্রকার হাতে প্রাণ নিয়েই’ তার বাবা-কাকারা কাজ করেছেন। সেদিন ৭০টারও বেশি মাইক লাগানোর কথা জানা যায়। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ শুরু করেন তখন তারা সবাই কাছাকাছিই ছিলেন। কল-রেডীর সেই সময়কার মালিকদের মধ্যে কেউ আর জীবিত নেই। দুই বছর আগে মারা গেছেন সর্বশেষ জীবিত স্বত্বাধিকারী কানাই ঘোষ।

কল-রেডীর চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, রেসকোর্স ময়দানে ব্যবহার হওয়া মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ডটি তারা সংরক্ষণ করেছেন। যেসব অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে ৭টি এখনও আছে। মাইক্রোফোনের মধ্যে আছে চারটি। দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব সংরক্ষণ করে রেখেছেন। সাগর ঘোষ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, একটা সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা করা না গেলে এগুলোও হয়তো এক সময় নষ্ট হয়ে যাবে। তার ভাষ্য, এসব স্মৃতিচিহ্নের কোনও কিছুই আর কল-রেডীর অফিসে (৩৬ হৃষিকেশ দাশ রোড) সংরক্ষণ করা নেই। যত্নের অভাব হতে পারে বলে সেগুলো অন্যস্থানে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু যে টেবিলটি (পোডিয়াম) সামনে দাঁড়িয়ে, তার ওপর চশমা রেখে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটি এখনও আছে। রাজধানীর হোসেনি দালান এলাকার হাজী চান মিয়া ডেকোরেটর সেদিন ওই টেবিল সরবরাহ করেছিল। টেবিলটি তাদের কাছে থাকার তথ্য পাওয়া গেল সাগর ঘোষের কাছ থেকে।

১৯৪৮ সালে কল-রেডী যাত্রা শুরু করে। প্রথমে নাম ছিল আরজা (আরজেএ) ইলেক্ট্রনিকস। পরে নাম বদলে রাখা হয় কল-রেডী অ্যাট সার্ভিস (আই অ্যাম অলওয়েজ রেডি অন কল অ্যাট ইওর সার্ভিস)। এর প্রতিষ্ঠাতা পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের ব্যবসায়ী প্রয়াত দয়াল ঘোষ। দয়াল ঘোষরা ছিলেন ছয় ভাই। এই ছয় ভাইয়েরই এক ভাই হরিপদ ঘোষ। হরিপদ ঘোষের চার ছেলের মধ্যে সবার বড় বিশ্বনাথ ঘোষ এখন কল-রেডীর চেয়ারম্যান। আর তৃতীয় ছেলে সাগর ঘোষ পরিচালক হিসেবে কল-রেডীর দেখভাল করছেন।

 



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here