‘মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ’

0


উচ্চশিক্ষার নামে আমাদের দেশে প্রচলিত যে শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে তা আসলে উচ্চশিক্ষিত হওয়ার উদ্দেশে নয়, পেশাগত কাজের উপযোগী হওয়াটাই এক্ষেত্রে মুখ্য বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন নিয়েও আমাদের ভাবনা নেই। পাসের হার বাড়ানোই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। এ কারণে ভালো শিক্ষকও তৈরি হচ্ছে না। তাই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘উচ্চশিক্ষায় চ্যালেঞ্জসমূহ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ’ শীর্ষক বৈঠকিতে আলোচকরা এসব কথা বলেন।

মঙ্গলবার (১২ মার্চ) বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এ আয়োজন।

ড. এইচ এম জহিরুল ইসলামবৈঠকিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ভাইস চ্যান্সেলর ড. এইচ এম জহিরুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাক্ষেত্রে নেতৃত্ব বড় ও প্রথম বিষয়। ভালো নেতৃত্ব থাকলে ছোট পরিসরে অনেক বড় কাজ করা সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমার শিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমাদের নেতৃত্বের অভাব। আমরা ভালো গবেষক, ভালো শিক্ষক পাচ্ছি, তবে সবক্ষেত্রে সবাই যে ভালো নেতৃত্ব দেবে এমন নয়। আবার তারাই ভালো নেতা হতে পারেন যদি যথাযথ সমন্বয় হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘জবাবদিহিতার অভাব আরেকটি বিষয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রশাসন সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এগুলোকেই আমি চ্যালেঞ্জ বলবো। যদি এগুলো কাটিয়ে ওঠা যায় তবে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব।’

শিক্ষার প্রতি আমাদের গণমাধ্যমের উদাসীনতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের গণমাধ্যম ব্যস্ত থাকে রাজনীতি নিয়ে, শিক্ষাক্ষেত্রের জটিলতাগুলো আড়ালেই থেকে যায়। এগুলো সামনে আসা উচিত।’

মুহাম্মাদ আলী নকীউচ্চতর শিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নকী বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা ও উচ্চতর শিক্ষার পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে পেশাগত দিকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, যাতে করে সে কাজ করে যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তি বিকাশ ভিন্ন। ব্যক্তি বিকাশ কোনও যন্ত্র দিয়ে হয় না।’

এ সময় বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত সংকটের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যার গড় করলে আমরা দুটো সমস্যা খুঁজে পাই। একটি হচ্ছে সঠিক পরিচালনা সংকট, আরেকটি হচ্ছে শিক্ষকদের মান। শিক্ষাব্যবস্থা ও মান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সরকারি কর্তৃপক্ষ। ফলে শিক্ষায় একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছে। ’৪৭-এর পর এটি আরও বেড়েছে। আলো ছড়ানো শিক্ষকদের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। উচ্চতর শিক্ষায় একজন ছাত্র নিজের জীবিকা নিয়েই ভাবছে। অন্যের জীবিকা দেওয়ার মতো প্রসারিত শিক্ষাজীবন তাকে আমরা দিতে পারছি না। উচ্চতর শিক্ষায় এই জায়গাটায় পৌঁছানোর ওপর জোর দিতে হবে।’ 

তিনি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘গত তিন বছরে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তিন কোটি টাকা ব্যয় করেছে। সেটি অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের জন্য। শিক্ষার মান উন্নয়নে সভা, সেমিনার, জার্নাল প্রকাশের মতো বিষয়গুলোতে ব্যয় করা হয়েছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিএসি এই বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে মান নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে এখন উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে মান নির্ধারণে কাজ করা শুরু হচ্ছে। এতে মিশন, ভিশন সবই নির্ধারিত হয়েছে। স্ট্যামফোর্ডে শুধু শিক্ষকদেরই ৫০টি কর্মশালা করা হয়েছে। নিজেদের শিক্ষক না থাকলে বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। সুতরাং আমি মনে করি, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আশাব্যঞ্জক অনেক কিছুই ঘটছে।’

সলিমুল্লাহ খানইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ‘মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যে শিক্ষা দিচ্ছি সেটিকে উচ্চশিক্ষা বলা যাবে না। এটিকে আমি কারিগরি শিক্ষা বলতে চাই। আমরা যে এমবিবিএস বা প্রকৌশল শিক্ষা দিচ্ছি এগুলো কারিগরি শিক্ষা। বাজার ধরার জন্য এইসব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যাতে শিক্ষার্থীরা পেশাগত স্থানে কাজ করে যেতে পারে। তবে এগুলো কোনওটাই উচ্চশিক্ষা নয়। কারণ উচ্চশিক্ষা হচ্ছে নির্মোহ শিক্ষা; কোনও চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে শিক্ষা দেওয়া।’ 

তিনি বলেন, ‘সামাজিকভাবে আমরা জানি, শিক্ষা মানেই হচ্ছে অধিকার। কতটুকু অধিকার সেটি আগে আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ অধিকার, নাকি দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধিকার। কার কতটুকু অধিকার সেটি জানতে হবে। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকারেও উচ্চশিক্ষা অধিকার হিসেবে উল্লিখিত হয়নি। এখানে সাধারণ শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে বলা হয়েছে। সেটাও আবার দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উপর নির্ভর করবে। আমাদের সামাজিক গতিশীলতার কারণেই শিক্ষিত হচ্ছি। চাষার ছেলে রাষ্ট্রপতি হচ্ছে। শিক্ষার কাজ গোটা জাতির জন্য যোগ্য লোক তৈরি করে তোলা। এখন মানুষ হিসেবে আমি দেশ ও জাতির সম্পদ। আমার পেছনে দেশ খরচ করে আর আমি বিদেশে চলে যাই।’

দদদদবাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ মোহাব্বত খান বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা কোনও ভিশন বা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারিনি। ভিশন যখন নেই, তখন মিশনও থাকছে না। তাই নীতিনির্ধারণী কোনও লক্ষ্যও নেই। আমরা বাইরের চাকরির মার্কেট যাচাই করে কাউকে শিক্ষা দিই না। একই সঙ্গে শেখার আগ্রহ কমেছে। এটিও মানতে হবে। এসব নানাবিধ কারণে নেতৃত্বও আসেনি। যারা সত্যিকারার্থে যোগ্য তারা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে। এটি ভাবার বিষয়।’

উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইউজিসির দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিশ্চিত করা। অসঙ্গতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। এই কাজে ইউজিসির যে অবকাঠামো দরকার তাতে ঘাটতি রয়েছে। মঞ্জুরি কমিশনের প্রধান জটিলতা শুরু হয় সদস্য নির্ধারণ নিয়ে। এখানে কোনও সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। আর এই কমিশনকে পারিপার্শ্বিক চাপ সামলাতে হয় অনেক বেশি। এছাড়া আমাদের কমিশনে লোকবলের অভাব। আবার যথাযথ লোক নিয়োগের ক্ষেত্রেও চাপের সম্মুখীন হতে হয়। এই হচ্ছে সার্বিক অবস্থা। এক্ষেত্রে ইউজিসির কাজ করা খুব কঠিন।’

গড়গগগগবাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোস্তফা আজাদ কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ৯-১০ লাখ শিক্ষার্থী।  তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর সবাইকে উচ্চশিক্ষা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই, কিন্তু আবার উচ্চশিক্ষাকে অস্বীকার করার উপায়ও আমাদের নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় মনে হয়, যারা বের হয়েছে তাদের সবার উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি আমরা সামাজিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করি, তাহলে আমাদের সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ এখন ডিজিটালাইজেশনের যুগ। আমরা যদি মনে করি, পঞ্চম শ্রেণি পাস করে কেউ এই বিষয়ে উচ্চশিক্ষা বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে তা কিন্তু নয়। যদি আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চাই, উচ্চশিক্ষার পথ ধরে হাঁটতেই হবে।’

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকে ১০ লাখ পাস করা শিক্ষার্থীর মধ্যে যে এক লাখ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে তারাই বা কী পাচ্ছে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোটাই তো মুখস্ত-নির্ভর। এগুলোর দিকে মনোযোগী হতে হবে আমাদের। উচ্চশিক্ষার মান যদি উচ্চতর না হয়, তবে আমরা সমাজের জন্য বোঝা তৈরি করছি বলেই মনে হয়। উচ্চশিক্ষার মান বা কোয়ালিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

উদিসা ইসলামবাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম আমাদের শিক্ষার মানের অবনমন প্রসঙ্গে বলেন, ‘আশার জায়গাগুলোতে আশান্বিত হওয়ার কোনও কারণ আমি দেখি না। কেননা সবকিছুই শুধুমাত্র কাগজে-কলমে হচ্ছে। কিন্তু আসলে আমাদের যেটি প্রয়োজন, একজন ভালো শিক্ষক, সেটি কি কাগজে-কলমে মূল্যায়ন করে তৈরি করা সম্ভব? সম্ভব না। আমরা প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সব স্তরেই ৯৯ শতাংশ পাস করাতে গিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি  করছি তাতে আপনি কাকে ভালো শিক্ষক হিসেবে তৈরি করবেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা পৃষ্ঠা বাংলা লিখতে পারে না, তাকে দিয়ে মূল্যায়ন করানো হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যা যা করতে বলছে সেটা তো হচ্ছে না। বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানোন্নয়ন ও অন্যান্য খাতে অনেক টাকা ব্যয় হচ্ছে। সেই টাকাটা আপনি পেলেন কোথায়? সেই টাকা কারও কাছ থেকে নিতে হচ্ছে। সেই নেওয়াটায় চাপ পড়ছে একজন শিক্ষার্থীর ওপরে। এই যে শিক্ষা বাণিজ্য হচ্ছে, সেটি আমার মৌলিক অধিকার, নাকি বাণিজ্যের জায়গায় পৌঁছাবে, এটা নিয়ে বিতর্ক করে আমরা সমাধান করতে পারিনি। ফলে এতগুলো অসমাধানকৃত বিষয় নিয়ে আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, সেই পাটাতন শক্ত আছে কিনা, আমার সন্দেহ আছে।’

মুন্নী সাহাআজকের বৈঠকি অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সৌজন্যে। বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা যাচ্ছে এ আয়োজন।

 

 



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here