মারুফ জামানকে না চিনে গেট থেকে ফিরিয়েছিলেন নিরাপত্তাকর্মী

0


এক বছর তিন মাস পর গভীররাতে ধানমণ্ডির বাড়িতে ফিরে নিরাপত্তাকর্মীকে গেট (ফটক) খুলতে বলেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তবে চিনতে না পারায় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী প্রথমে তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। গেট থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ওই সময়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নওশাদ। তবে পরবর্তীতে বাড়ির ম্যানেজার আলমগীর হোসেন এসে মারুফ জামানকে চিনতে পেরে গেট খুলে বাসার ভেতরে নেন।

শনিবার (১৬ মার্চ) রাতে ধানমণ্ডির ৯/এ সড়কের ৮৯ নম্বর বাড়ির কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মী মো. আফাজ বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘স্যার (মারুফ জামান) অনেক রাতে এসেছেন। তখন নওশাদ নামে আমাদের এক নিরাপত্তাকর্মী গেটের দায়িত্বে ছিলেন। স্যার একাই আসেন। তিনি এসে গেট খুলতে বলেন। ভেতরে যাবেন বলে অনুরোধ করতে থাকেন। তবে নওশাদ তাকে চিনতে পারেনি। কারণ স্যার নিখোঁজ হওয়ার কয়েকমাস পর থেকে আমরা এখানে চাকরি পেয়েছি। তাই না চিনে আমাদের নিরাপত্তাকর্মী স্যারকে ঢুকতে দেয়নি। স্যার এসময় ভালো করে কথা বলতে পারছিলেন না। নিরাপত্তাকর্মী তাকে ঢুকতে না দেওয়ায় তিনি গেইটের সামনে থেকে সরে গিয়ে রাস্তার ভেতরে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন ম্যানেজার আলমগীর হোসেন ঘুম থেকে উঠেন। তিনি এসে স্যার, স্যার বলে ডাক দেন। এরপর গেট খুলে স্যারকে ভেতরে নিয়ে আসা হয়।’
আফাজ বলেন, ‘রাতে তিনি আসার পর তাকে তার মেয়েরা ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। এসময় সবাই কান্নাকাটি করেছে।’
মারুফ জামান অনেক শুকিয়ে গেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্যারের ছবি দেখেছি আগে। ছবিতে যে চেহারা তার দেখেছি, তার সঙ্গে কিছুই মিলে না। তিনি অনেক শুকিয়ে গেছেন।’
মারুফ জামানের ধারমণ্ডির বাড়ি
মারুফ জামান পরিবার নিয়ে এই ভবনের তৃতীয় তলায় থাকেন বলেও জানান তিনি। তবে তার ফিরে আসা নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীসহ সবাইকে কথা না বলার জন্য অনুরোধ করেছে মারুফ জামানের পরিবার। তাই নিরাপত্তাকর্মী এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজী ছিলেন না।
মারুফ জামানের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে এই নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘পুলিশ আসছিল দেখা করতে, তাদেরই ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি। আজকের কাউকে বাসায় পাঠাতে নিষেধ করেছে।’
এক বছর তিন মাস নিখোঁজ থাকার পর সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে একাই বাসায় ফিরেছেন। সোমবার (১৬ মার্চ) ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি মারুফ জামান বাসায় ফিরেছেন। আমাদের পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের বাসায় গেছেন।’
এদিকে মারুফ জামানের মেয়ে শবনম জামান ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার বাবার ফিরে আসা নিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার বাবা সাড়ে ১৫ মাস বা ৪৬৭ দিন পর ফিরে এসেছেন। আমি ও আমার বোন কৃতজ্ঞ তাদের কাছে, যারা এই সময় আমাদের সহযোগিতা করেছেন।’
তিনি তার স্ট্যাটাসে এ বিষয়ে আর কিছু না জানতে চাইতে সবাইকে অনুরোধ করেছেন। এবিষয়ে তিনি আর বেশি কিছু বলবেন না বলেও সেখানে জানিয়ে দিয়েছেন।
২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ধানমণ্ডির ৯/এ বাসা থেকে বিমানবন্দর যাওয়ার উদ্দেশে বের হয়ে নিখোঁজ হন মারুফ জামান। এ ঘটনার পরদিন দুপুরে তার মেয়ে সামিহা জামান ধানমণ্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নং ২১৩। জিডিটি থানা পুলিশ ও ডিবি তদন্ত করেছে। তবে তারা তার কোনও হদিস দিতে পারেননি।
ডিএমপির রমনা বিভাগের ধানমণ্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. আব্দুল্লাহেল কাফি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মারুফ জামান শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তার বাসার সামনে ঘোরাফেরা করছিলেন। তখন স্থানীয়রা তাকে দেখে চিনে ফেলেন। তারপর বিষয়টি মারুফ জামানের বাসার নিরাপত্তাকর্মীকে জানায় স্থানীয়রা। তখন নিরাপত্তাকর্মী মারুফ জামানের মেয়েকে খবর দিলে, মেয়ে এসে তাকে বাসায় নিয়ে যায়।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘উনি প্রথমে নিজের বাসা চিনতেছিলেন না। তাকে স্থানীয়রা বাসায় নিয়ে যায়। তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাদের পুলিশ কর্মকর্তা ওই বাসায় পাঠানো হয়েছিল। তবে মারুফ জামানের মেয়ে জানিয়েছেন, তিনি অসুস্থ আছেন, কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তার সঙ্গে দেখা করা যাবে না। এরপর আমাদের পুলিশ অফিসার চলে আসেন। তবে পুলিশ তার সঙ্গে শিগগিরই এ বিষয়ে কথা বলবেন।’
মারুফ জামান রাষ্ট্রদূত হিসেবে ২০০৮ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি কাতারে রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাজ্যে কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি অবসর নেন। পরিবারের সঙ্গে তিনি ধানমণ্ডির বাসায় থাকতেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি ধানমণ্ডির বাসা থেকে প্রাইভেটকারে বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তার মেয়ে সামিহা জামান বিদেশ থেকে বিমানবন্দরে এসে পৌঁছানোর কথা ছিল। মেয়েকে আনতেই তিনি বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বিমানবন্দর যাননি, বাসায়ও ফিরে আসেননি। পরিবার তার কোনও খোঁজ না পেয়ে জিডি করেন। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মারুফ জামানের ব্যক্তিগত গাড়িটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৩০০ ফুট সংযোগ সড়ক থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার পর নিখোঁজ ফারুক জামানের ছোট ভাই রিফাত জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না আসলে কী হচ্ছে? আমার ভাই নিজেই ড্রাইভ করে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি দুর্ঘটনায় পড়েছেন-এমন আশঙ্কা করেছিলাম প্রথমে। এখন তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে। লোকজন বলাবলি করছে, ফোর্স ডিজ-অ্যাপিয়ারেন্স হতে পারে। কিন্তু আমার ভাইতো কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত না।’
এদিকে ডিএমপি’র রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদারের কাছে সে সময়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখনও তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তারপরও আমরা খোঁজ নিচ্ছি।’ তবে ১৫ মাসেও তার খোঁজ বের করতে পারেনি পুলিশ।

 



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here