রিমান্ডে দায় স্বীকার এমএ কাদেরের

0


পণ্য রফতানি না করেও ভুয়া রফতানি বিলের মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাতের দায় স্বীকার করেছেন ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদের।

তিনি বলেছেন, তাকে এই ঋণ পাইয়ে দেয়ার পেছনে ১৫ থেকে ২০ জন ব্যাংক কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়ে নানাভাবে সহায়তা করেছেন।

১১ মার্চ থেকে ১০ দিনের রিমান্ডে থাকা কাদের জিজ্ঞাসাবাদে দুদক টিমকে এসব চঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। পণ্য রফতানির ৪২১টি ভুয়া ডকুমেন্ট (বিল অব লিডিং) জনতা ব্যাংকে জমা দিয়ে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় দুদকের মামলায় তিনি রিমান্ডে আছেন। তবে তিনি জিজ্ঞাসাবাদে এখনও কোনো রাঘববোয়ালের নাম প্রকাশ করেননি বলে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের তত্ত্বাবধানে সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান আসামি কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।

দেশের বাইরে অর্থ পাচারের কোনো তথ্য কাদের দিয়েছেন কি না- জানতে চাইলে দুদকের সৈয়দ ইকবাল হোসেন বলেন, আসামি কাদের কিছু তথ্য দিয়েছেন। আমরা তাতে সন্তুষ্ট নই। তার কাছ থেকে আরও বেশকিছু তথ্য নেয়ার চেষ্টা করছি।

সূত্র জানায়, শনিবার জিজ্ঞাসাবাদের ষষ্ঠ দিনে এমএ কাদের দুদক টিমের কাছে স্বীকার করেন, ‘আমি ভুল করে ফেলেছি। ব্যবসা করতে গিয়ে এতবড় ভুল হবে বুঝতে পারিনি। এজন্য আমি অনুতপ্ত। বুঝতে পারিনি এভাবে আটকে যাব (ধরা খেয়ে যাব)।’

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, তাকে এ কাজে ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা নানাভাবে সহায়তা করেছেন। রিমান্ডে তিনি সেসব কর্মকর্তার নামও প্রকাশ করেছেন। দুদক কর্মকর্তারা তার কাছে জানতে চান, বিপুল অঙ্কের ওই টাকা জালিয়াতি করে ব্যাংক থেকে বের করে কী করেছেন- এর কোনো সন্তেুাষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি।

তবে দুদকের টিম জানতে পেরেছে, ভুয়া ডকুমেন্টের বিপরীতে ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বের করে তার মধ্যে একটা বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন।

কাদের জানিয়েছেন, কিছু টাকা দিয়ে তিনি সাভারে ২/৩টা ফ্যাক্টরি করেছেন। নতুন কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। ক্রিসেন্ট লেদার ফ্যাক্টরি করেছেন।

দুদকের কর্মকর্তারা আশাবাদী, কাদেরের কাছ থেকে নেয়া আর্থিক সুবিধাভোগীদের নাম শিগগিরই বের করতে পারবেন। কাদের যেসব ব্যাংক কর্মকর্তার নাম বলেছেন, তাদের মধ্যে জনতা ব্যাংক ইমামগঞ্জ শাখার ম্যানেজার রেজাউল করিম, ফরেঞ্জ এক্সচেঞ্জ শাখার ডিজিএম- মুহাম্মদ ইকবাল ও আবদুল্লাহ আল মামুন, জিএম মো. ফখরুল আলম, মো. জাকির হোসেন, একেএম আসাদুজ্জামান, জনতা ব্যাংকের ওই শাখার কর্মকর্তা কাজী রইস উদ্দিন আহমেদ, এজিএম মো. আতাউর রহমান সরকার ও এসএম শরীফুল ইসলাম, এসপিও মো. খায়রুল আমিন ও বাহারুল আলম, মো. মাগরেব আলী, অফিসার ইনচার্জ (এক্সপোর্ট) মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সিনিয়র অফিসার ইনচার্জ মো. সাইদুজ্জামান ও মো. মনিরুজ্জামান ।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আশা করা যাচ্ছে, বাকি চারদিনে অর্থ পাচার ও জালিয়াতিতে জড়িতদের সবার বিষয়ে কাদেরের কাছ থেকে তথ্য বের করা সম্ভব হবে।

তার এই ঋণ জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে কিছু লোক জড়ো হয়েছিলেন সুবিধা নিতে। তাদের পরিচয়ও জানতে চায় দুদক। কাদেরের কাছ থেকে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ যেসব সুবিধাভোগীর নাম-পরিচয় জেনেছে দুদক, তাদের সবাইকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের ‘ঋণ ডাকাতির ঘটনায় চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ২২ জনের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা করে দুদক। এর আগে ৩০ জানুয়ারি এ ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে তিনটি মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। মামলার পরপরই ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরকে গ্রেফতার করে সংস্থাটি।

তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়। আসামি করা হয় ১৭ জনকে। এছাড়া দুদকের ৫ মামলায় কাদেরসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, জাল কাগজপত্র তৈরি করে জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়।

মামলায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের মালিকদের মধ্যে সাতজনকে আসামি করা হয়। তারা হলেন- গ্রুপটির চেয়ারম্যান এমএ কাদের, পরিচালক সুলতানা বেগম ও রেজিয়া বেগম, রূপালী কম্পোজিট লেদারের পরিচালক সামিয়া কাদের নদী, রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিটুন জাহান মীরা এবং লেসকো লিমিটেডের পরিচালক হারুন-অর-রশীদ। এছাড়া ব্যাংকারদের মধ্যে জনতা ব্যাংকের তৎকালীন দুই জিএমসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়। যাদের নাম জিজ্ঞাসাবাদে দুদকের কাছে প্রকাশ করেছেন কাদের।

জনতা ব্যাংকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ওই ঋণ জালিয়াতির ঘটনাকে ‘ডাকাতি’ হিসেবে মন্তব্য করে তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তা শনিবার যুগান্তরকে বলেন, রফতানি বিল কেনার ক্ষেত্রে প্রথম লেনদেনের আগে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হয়।

এছাড়া বিক্রয় চুক্তির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া, তিন মাস অন্তর ক্রেতার ক্রেডিট রিপোর্ট সংগ্রহসহ কয়েকটি শর্ত পালন করতে হয়। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখায় এসব নির্দেশনা পালন করা হয়নি।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here