শুধু মুসলমানরাই জঙ্গি নয়

0


যতবার আমি ভাবি, ততবার আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তামিম-মুশফিকদের ভয়ার্ত চেহারা। হ্যাগলি পার্কের ভেতর দিয়ে দৌড়ে হ্যাগলি ওভালে যাচ্ছিলেন তারা। আসলে তারা নতুন জীবন নিয়ে ফিরছিলেন। যতবার ভাবি, ততবার আমার মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে আসে। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য সত্যিকার অর্থেই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল। নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দিনটি তাদের ইতিহাসে কালো দিনের একটি। টিম বাসটি আর মিনিট পাঁচেক আগে আল নুর মসজিদের সামনে গেলে দিনটি বাংলাদেশেরও সবচেয়ে কালো দিনের একটি হতে পারতো। জুমার নামাজ ধরতে হলে আরেকটু আগে যাওয়াই দস্তুর ছিল। প্র্যাকটিস শেষ করতে করতে কিছুটা দেরি হয়ে যায়। দেরিও যে কখনও কতটা স্বস্তির হতে পারে, তা এখন গোটা জাতি অনুভব করছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা মসজিদের ৫০ গজের মধ্যে বাস থেকে নেমেওছিলেন। এক নারী সাবধান করলে তারা বাসে ওঠে পড়েন। তখনও গুলি চলছিল। ততক্ষণে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ায় বাস নিয়ে ফিরতেও পারছিলেন না। তাই তারা বাসে শুয়ে পড়েন। আবার শঙ্কা, সন্ত্রাসী যদি রাস্তায় এসে বাসে গুলি করেন। তাই তারা দ্রুত নেমে হ্যাগলি পার্কের ভেতর দিয়ে হ্যাগলি ওভালের ড্রেসিং রুমে চলে যান। সেখানে ভীত-সন্তস্ত্র বাংলাদেশ দল দুই ঘণ্টা আটকে ছিল। পরে তাদেরকে টিম হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই বোর্ডের সম্মতিতে শনিবার থেকে হ্যাগলি ওভালে শুরু হতে যাওয়া সিরিজের তৃতীয় টেস্ট বাতিল করে দ্রুত দেশে ফিরছে বাংলাদেশ দল।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বেঁচে ফিরলেও ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৪৯ জন মারা গেছেন। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তেই ৪৯ জন মানুষের মৃত্যু আমাদের বেদনার্ত করে। আর যখন জানতে পারি, সে ৪৯ জনে তিনজন বাংলাদেশিও আছেন, তখন সেই শোক, বেদনা আরো বাড়ে।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। কিন্তু রেখে এসেছে অনেকগুলো প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন হলো নিরাপত্তা। বিশ্বজুড়েই এখন খেলোয়াড় বা সেলিব্রেটিদের বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হয়। কারণ তারা সহজ টার্গেট। তাদের ওপর হামলা চালাতে পারলে আলোচনা বেশি হয়। তাছাড়া ক্রিকেটে নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি জুয়ারিদের সংস্রব থেকে ক্রিকেটারদের আড়ালে রাখতেও নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয় তাদের। আশির দশক, নব্বইয়ের দশকেও অবস্থা এত নাজুক ছিল না। তখন রীতিমত সরাসরি হোটেল রুমে নক করে খেলোয়াড় বা ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলা যেতো। সম্ভবত ১৯৯৪ সালে তখনকার হোটেল শেরাটনে ভারতের অতুল বেদাদের রুমে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ভারতীয় দলের বেশ কয়েকজন সদস্য সে রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। সে আড্ডায় আমারও কিছুক্ষণ থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে সময় বিদেশি খেলোয়াড়রা বঙ্গবাজার বা অন্য কোথাও শপিং করতে গেছেন, এমন খবরও এসেছে। কিন্তু এখন এগুলো ভাবতেই অবাক লাগে। খেলোয়াড়রা এখন অনেক দূরের মানুষ। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, খেলোয়াড়দের নাগাল পেতে সাংবাদিকদেরই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। আমরা দেখি বাংলাদেশে কোনও ক্রিকেট দল এলে তাদের সরকার প্রধানের সমান মানে তিন স্তরের নিরাপত্তা দেওয়া হয়। তাদের চলাচলের সময় রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশে আসা কোনও দলের কোনও খেলোয়াড়ের নিজের ইচ্ছামত মসজিদ, মন্দির বা গির্জায় যাওয়ার সুযোগ নেই। যেতে হলে তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা বেস্টনিসহ যেতে হবে।

আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি নিউ জিল্যান্ডে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যে বিপদে পড়েছিল এবং যেভাবে ঝুঁকি নিয়ে পার্কের ভেতর দিয়ে দৌড়ে এসেছে; তা বাংলাদেশে হলে কখনোই হতো না। এত নিরাপত্তা দেওয়ার পরও বাংলাদেশকে কত কথা শুনতে হয়। এক ক্ষুব্ধ দর্শক ওয়েস্ট ইন্ডিজের টিম বাসে ঢিল ছুড়েছিল। সেটা কোনও সন্ত্রাসী হামলা ছিল না, নিছক দর্শকের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। তারপরও কত কথা শুনতে হয়েছে। হামলার আশঙ্কা আছে, এই ধুয়া তুলে অস্ট্রেলিয়া তো একবার নির্ধারিত সফর বাতিল করেছিল। শ্রীলঙ্কার টিম বাসে সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনায় গত ১০ বছর ধরে পাকিস্তানে যাচ্ছে না কোনও ক্রিকেট দল। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর নিউ জিল্যান্ডকে কি তেমন কোনও নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হবে? আমি নিশ্চিত পড়তে হবে না। আমি চাইওনা তেমন কিছু হোক। আমি চাই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। আমরা তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশ, আমাদের ওপর যত চোটপাট করা যায়; সন্ত্রাসীর বাড়ি অস্ট্রেলিয়া হলেও, হামলার ঘটনা নিউ জিল্যান্ডে ঘটলেও তাদের কিছুই হবে না। একবার ভাবুন, নিউ জিল্যান্ড দল বাংলাদেশে এলে যদি এই ঘটনা ঘটতো, তাহলে কী হতো? ঘটলে কী হতো, সেটা নিয়ে ভাবার দরকার নেই। কারণ আমি জানি বাংলাদেশে যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার কোনও সুযোগই নেই। আমরা বিদেশি দলগুলোকে যতটা নিরাপত্তা দেই, আমরাও তাদের কাছে ততটাই আশা করবো। কিন্তু ততটা কি পাই? পাই না যে, সেটা ক্রাইস্টচার্চে প্রমাণিত। পেলে প্রায় পুরো বাংলাদেশ দল অরক্ষিত অবস্থায় কিভাবে মসজিদে যেতে পারলো? কিভাবে তারা পার্কের ভেতর দিয়ে দৌড়ে গেলো? কেন তাদের দুই ঘণ্টা হ্যাগলি ওভালের ড্রেসিং রুমে আটকে থাকলো? আইসিসির কাছে দাবি জানাচ্ছি– যে কোনও টুর্নামেন্ট বা সিরিজের আগে বিশ্বজুড়ে যেন ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। আর নিরাপত্তার মানদণ্ড যেন হয় বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছে অনুরোধ, তারা যেন নিরাপত্তা ছাড়া চলাফেরা না করেন। মাশরাফির লেখায় দেখলাম, এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ওয়ানডের সময়ও তারা এই মসজিদেই জুমার নামাজ পড়েছেন। কী ভয়ঙ্কর!

শুক্রবার সকালে প্রথম খবর পাই, নিউ জিল্যান্ডে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। বাংলাদেশ দল অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। প্রথম লাইনটি শোনার পরই, আরেকটা শঙ্কা আমার মনে আসে। যদি হামলাকারী মুসলমান হয়, তাহলে আবার বিশ্বজুড়ে মাতম শুরু হবে। শান্তির ধর্ম ইসলামকে আবার সন্ত্রাসের ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু হবে। বিশ্বের কোথাও কোনও সন্ত্রাসী হামলা হলে, হামলাকারীর পরিচয় মুসলমান কিনা সেটাই আগে যাচাই করা হয়। তারপর দ্রুত তাকে জঙ্গি বানানোর চেষ্টা হয়। কোনও লিঙ্ক পেয়ে গেলেই বিশ্বজুড়ে মিডিয়ায় মাতম শুরু হয়। কিন্তু আমেরিকা-ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়। হামলাকারী মুসলমান ও একা হলে তাকে ‘লোন উলফ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। আর মুসলমান না হলে তাকে সাধারণ সন্ত্রাসী বা মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। দুইবছর ধরে সে এই হামলার পরিকল্পনা করছিল। সে একাধিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে মাথায় হেলমেট পরে, তাতে ক্যামেরা লাগিয়ে, ফেসবুকে লাইভ করে, ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। সে এর আগে হামলার কারণ সম্বলিত ৭৪ পৃষ্ঠার মেনিফেস্টো অনলাইনে জানিয়ে দিয়েছে। সে কট্টর ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গ। সে অভিবাসীবিরোধী এবং ইসলামবিদ্বেষী। সে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য চায়। মুসলমানরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সন্ত্রাস করলে সে হয় জঙ্গি, আর খ্রিস্টান বা ইহুদি হামলা চালালে হয় মানসিক ভারসাম্যহীন সন্ত্রাসী। এই দ্বৈত ভাবনা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানতে হবে শুধু জঙ্গির কোনও ধর্ম নেই।

এটা ঠিক, বিশ্বজুড়ে এখন মুসলমান সন্ত্রাসীর সংখ্যাই বেশি। সিরিয়ায়, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে আইএস, তালেবান বা জইশ মোহাম্মদের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে। কিন্তু সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামের কোনও সম্পর্ক নেই। ইসলামের নামে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়, তারা নামে মুসলমান হলেও বিশ্বাসে মুসলমান নয়। একজন সত্যিকারের মুসলমান কখনোই অন্য কোনও মানুষের ওপর হামলা চালাতে পারে না। অল্পকিছু সন্ত্রাসীর জন্য একটি ধর্মকে কোণঠাসা করার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আমাদের সবার মানসিকতা বদলাতে হবে। সন্ত্রাসকে দেখতে হবে সন্ত্রাসের দৃষ্টিতেই। সন্ত্রাসীর কোনও ধর্ম নেই, জাতি নেই, দেশ নেই, বর্ণ নেই। মুসলমান হোক, ইহুদি হোক, খ্রিস্টান হোক, সাদা হোক, কালো হোক; সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সত্যিকারের জিরো টলারেন্স নিয়ে যুদ্ধ নামতে হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইটা হতে হবে বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ দল নিউ জিল্যান্ড গিয়ে নিরাপদ থাকুক, সিরিয়ার অভিবাসীরা জার্মানিতে গিয়ে নিরাপদে থাকুক, জাপানের মানুষ বাংলাদেশে নিরাপদে থাকুক। গোটা বিশ্বই মানুষের জন্য নিরাপদ হোক। সন্ত্রাসীরা যেন কোথাও ঠাঁই না পায়, আশ্রয় না পায়। কোনও কৌশলের কারণেও কেউ যেন সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা না দেয়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here