সংকটে জর্জরিত বস্ত্র খাত

0


ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব এবং সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দেশীয় শিল্প বস্ত্র খাত নানামুখী সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে।

অবশ্য কেবল বস্ত্র খাতই নয়, আমাদের দেশে ভুল নীতি ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অন্যান্য অনেক খাতকে অকাল মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছে। যেখানে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো নিজেদের বস্ত্র খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও শিল্পটির উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা দিয়ে থাকে, সেখানে আমাদের অবস্থা একেবারে বিপরীত।

আমরা মনে করি, বস্ত্র খাত তো বটেই, অন্য শিল্পগুলোতেও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া দরকার। অন্যথায় পর্যায়ক্রমে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নপূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।

জানা যায়, বস্ত্র খাতে মাটি, পানি ও শ্রম ছাড়া আর সবকিছুই আমদানিনির্ভর। উদ্বেগের বিষয়, এ আমদানিনির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

এ খাতে সোয়েটারে ৯০ শতাংশ, ওভেনে ৮০ শতাংশ এবং নিট খাতে ৩০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এছাড়া বন্ডের নামে কালোবাজারে সুতা ও কাপড় বিক্রি এবং অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় জমে যাওয়াও এ খাতের জন্য অশনিসংকেত। এ অবস্থায় দেশীয় শিল্প হিসেবে বস্ত্র খাতকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে নানা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার বিকল্প নেই।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা কেবল তৈরি পোশাক বা আরএমজির রফতানি আয় নিয়ে প্রতি বছর আনন্দে উৎফুল্ল হয়েই দায়িত্ব শেষ করি; কিন্তু আমদানি আয়ের সুনির্দিষ্ট অঙ্কে পৌঁছানোর জন্য কত বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়েছে, তার কোনো হিসাব কেউ করে না। এমনকি খোদ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নেয় না।

এ পর্যায়ে এসে আরএমজির রফতানি আয়ের পাশাপাশি এর জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয়ের হিসাবও যদি কষা হয় তবেই নিজস্ব বস্ত্র খাতের উন্নয়নের বিষয়ে নজর দেয়া সহজ হবে। ওভেন খাতের জন্যই যে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলার বিকল্প নেই, তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলে এলেও সেভাবে বিষয়টিকে আমলে না নেয়া দুঃখজনক।

শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলতে না পারলে তৈরি পোশাকের রফতানি আয় এর কাঁচামাল রফতানির পেছনে চলে যাবে এবং আমরা কেবল দর্জি হিসেবে সেলাইয়ের কিছুটা মজুরি পেয়েই সন্তুষ্ট থাকব। বর্তমানে হচ্ছেও তাই।

আশার কথা, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশীয় একটি শিল্পের এভাবে নানামুখী সংকটে পড়া কারও কাম্য নয় এবং বর্তমান ব্যবসাবান্ধব সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।

আমরা আশাবাদী, বস্ত্র খাতের স্বার্থে কালোবাজারে আমদানিকৃত সুতা ও কাপড় কেনাবেচা বন্ধ এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাপড় ও সুতা আমদানি বন্ধ রাখা যেতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞদের সঙ্গে বসে বস্ত্র খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ, গার্মেন্টসহ অন্যান্য রফতানি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা, শিল্পের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ নিশ্চিত এবং খাত বিশেষে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা দরকার। অন্যথায় বস্ত্র খাতের আমদানিনির্ভরতা জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে ভোগাবে, তাতে সন্দেহ নেই।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here