বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে কথিত রাষ্ট্র ভারতে সম্প্রতি যে নির্বাচন হয়ে গেল তাতে জিতল কে, পরাজয়ই বা কার? জিতল কে সে তো দেখাই গেছে: জিতেছেন নরেন্দ্র মোদি, হেরেছেন তাঁর প্রতিপক্ষ। কিন্তু আসল পরাজয়টা কার? না, গণতন্ত্রের নয়; বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ তো নির্বাচন, সে নির্বাচন হয়েছে এবং বিরোধীরা যা–ই বলুন, নির্বাচনে এমন কোনো বড় রকমের অনিয়ম ঘটেনি যেটা না ঘটলে ফল অন্য রকম দাঁড়াত। মোদির ঝড় তো মিথ্যা ছিল না। তিনি গণতান্ত্রিক উপায়েই নির্বাচিত হয়েছেন। আসল পরাজয়টা কিন্তু অন্য এক পক্ষের, জনগণের। জনগণ হেরে গেছে। মোদি সরকারের দুঃশাসন ভারতবাসীকে আরও পাঁচ বছর সহ্য করতে হবে। উৎপীড়ন ঘটবে সংখ্যালঘুসহ দুর্বল মানুষদের, যারা জনগণের শতকরা ৮০ জন এবং ভারত বাধ্য হবে তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি থেকে মুখ ঘুরিয়ে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে এক কদম এগোতে।

বিরোধী দলগুলোও হেরে গেছে। লজ্জাজনক তাদের পরাজয়। কিন্তু তাদের সঙ্গে মোদির যে ঝগড়া সেটা মৌলিক শত্রুতার ছিল না; ছিল ক্ষমতা দখল-সম্পর্কিত। বিরোধী দলগুলো আওয়াজ তুলেছে ‘মোদি হটাও’, কিন্তু একবারও বলেনি মোদি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতিনিধি ও সংরক্ষক, তাকে হটাও। তারা বলেছে মোদি চৌকিদার নয়, সে চোর অতিশয়; কিন্তু বিরোধী নেতারা এমন সাক্ষ্য উপস্থিত করতে পারেননি যে ÿক্ষমতায় গেলে তাঁরা চুরি করবেন না বা অতীতে চুরি করেননি। তাঁরা চেয়েছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা যেমন আছে তেমনি থাকুক, মোদির জায়গাতে তাঁরা নিজেরা আসুন। সে কাজে তাঁরা সফল হননি। ব্যর্থতার কারণ আছে। প্রথমত তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেননি; জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এটা ঠিক ছিল না। দ্বিতীয়ত, মোদি যে আওয়াজটা তুলেছিলেন, সেটা তাঁরা তুলতে পারেননি। মোদির আওয়াজটা ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের। পাঁচ বছর আগে তিনি অর্থনীতির উন্নতি চাই, ভারতীয় পণ্যের বিক্রি চাই এসব কথা বলেছেন; এবার ওসব বাহুল্য নেই, অর্থনীতি নেই, এবার শুধু জাতীয়তাবাদ। এবার বলেছেন ভারতের গৌরবের কথা; তাঁর বক্তব্যে ভারত অর্থ দাঁড়িয়েছে হিন্দু ভারত; ভারতীয় জাতীয়তাবাদ হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ। সম্ভব হলে ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রই বানিয়ে ছাড়বেন; পৃথিবীতে ভারত একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র, ইসরায়েল যেমন একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র।

মোদি–ম্যাজিকের কথা শোনা গেছে। তা মোদি নানা রকমের জাদু দেখিয়েছেন বৈকি, এমনকি ধ্যানেও বসেছেন। কিন্তু তাঁর আসল শক্তি দুজায়গাতে, একটি হচ্ছে ওই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ প্রচার, অন্যটি হচ্ছে পুঁজিপতি ও পুঁজিবাদীদের অকুণ্ঠ সমর্থন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জিনিসটা সব সময়ই একটা রহস্যাবৃত জিনিস ছিল। কেননা ভারত তো কখনোই এক জাতির দেশ ছিল না, এটি বহুজাতির দেশ এবং সবাই জানেন যে জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান ধর্ম নয়, প্রধান উপাদান ভাষা। সেই হিসেবে সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় ভারতে কমপক্ষে ১৭টি প্রধান জাতি ছিল। ভাষাগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে এই উপমহাদেশ ইউরোপ মহাদেশের তুলনায় মোটেই ছোট নয়। বাইরে থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা এসেছে, এসে ভারতকে নিজেদের শাসন ও শোষণের অধীনে নিয়ে প্রশাসনিক প্রয়োজনে রাজনৈতিকভাবে ভারতকে এক করে দিয়েছে। সব শেষে আগমন ব্রিটিশের; ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে ভারতীয়দের একটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের উপযোগিতা ছিল। কিন্তু সে সময়েও ভারতের বহুজাতিক পরিচয়টা অবলুপ্ত হয়ে গেছে, তা নয়।

ওদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দাবি করেছিল যে ভারতে একটিমাত্র জাতি আছে, সেটি ভারতীয় জাতি, কিন্তু ওই জাতীয়তার ভিত্তিটা যে কী তা তারা বলতে পারেনি। ভারতের মুসলমানরা ভাবল কংগ্রেস ধর্মীয় অর্থাৎ হিন্দু জাতীয়তাবাদের কথা বলছে; ভয় পেয়ে তারা তাই আওয়াজ তুলল যে ভারতে একটি জাতি নয়, রয়েছে দুটি জাতি; একটি হিন্দু, অপরটি মুসলমান। সম্প্রদায়কে জাতি বলে চালিয়ে দেওয়ার ওই পথেই দেশভাগ হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক সমস্যার কোনো প্রকার সমাধান হয়নি। ভারতীয় জনতা পার্টি সরাসরি কোনো প্রকার লুকোছাপা না করে হিন্দু ধর্মকেই জাতীয়তাবাদের প্রধান উপকরণ বলে চালাবার অটল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। ভারতীয় কংগ্রেস যা করতে পারেনি, ভারতীয় জনতা পার্টি সেটা সম্ভব করবে, এমন সংকল্প।

তবে তাদের ওপরের ওই হিন্দু গেরুয়া আচ্ছাদনের ভেতরে যা আছে সে বস্তুটি মোটেই আধ্যাত্মিক নয়, সেটি পুরোপুরি ইহজাগতিক। সেটি হলো পুঁজিবাদ। সমগ্র বিশ্বে পুঁজিবাদ এখন পতনের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে এবং টিকে থাকার জন্য আগে যেসব ছাড় দিয়েছে ও উদারনৈতিকতার যে ধরনের ভান করেছে, সেসব ছুড়ে ফেলে দিয়ে চরম ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করেছে। এখন সে যেমন নৃশংস তেমনি লজ্জাহীন; নৃশংসদের অবশ্য লজ্জা বা শঙ্কা কিছুই থাকবার কথা নয়। এই ফ্যাসিবাদীরা ধর্ম, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবিদ্বেষ, আঞ্চলিকতা, পিতৃতান্ত্রিকতা, এসব বিষাক্ত আবর্জনাকে দুহাতে ব্যবহার করে; মানুষকে তারা উত্তেজিত করে, ঠেলে দেয় আদিমতার দিকে। উত্তেজিত মানুষ নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যাগুলো ভুলে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুঁজিবাদ ভাবে, আপাতত বাঁচা গেল। ভারতে এবারের লোকসভা নির্বাচনেও ওই ফ্যাসিবাদী তৎপরতার প্রকাশটাই দেখা গেল। টাকা ও পেশিশক্তির যদৃচ্ছা ব্যবহার তো ঘটেছেই, ব্যবহার করা হয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদও।

মূল বিরোধীরা মোদি হটাও মোদি হটাও বলে পাড়া মাতিয়েছে, কিন্তু মোদির জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি। মোদির দলের শপথ, বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে রামমন্দির তৈরি করবে। প্রধান বিরোধী এবং বিরোধীদের ভেতর একমাত্র সর্বভারতীয় দল কংগ্রেস কিন্তু বলেনি যে তারা ওই সব কাজের বিরোধী; বরং নির্বাচনের অল্প দিন আগে তাদের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেই দিয়েছেন যে রামমন্দির বানানো নিয়ে বিজেপি যা করছে তা ছলনামাত্র; রামমন্দির বানাব আমরা। দলের পক্ষ থেকে তাঁর এই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। মোদি বলেছেন তিনি রামের অনুসারী; তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞায় সবচেয়ে যিনি মুখর ছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন যে রামের চেয়ে দুর্গা বড়, এবং তাঁরা, পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা মা দুর্গার পূজারি, বাংলায় এলে রাম দুর্গাকে প্রণাম করবে। মমতা দিদি পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের স্বার্থের রক্ষকের ভূমিকা নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর আসল লড়াইটা দেখা গেল দুর্গার পক্ষে দাঁড়িয়ে রামের বিরোধিতার। রাম বড় না দুর্গা বড় এই ধর্মীয় বাহাসে জনগণের ইহজাগতিক স্বার্থের স্থানটা কোথায়? কোনখানে? কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষ বলে বড়াই করত, ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে তারা ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি লিখে দিয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে পারেনি, আসলে তারা চেয়েছিল সব ধর্মের সমান মর্যাদা, যেটা মোটেই ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। এখন তো কেবল তৃণমূল কংগ্রেস নয়, মূল কংগ্রেসও মোদির ধর্মবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হারিয়ে ফেলেছে।

গান্ধীজির প্রসঙ্গ এখানে আসে। তিনি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, কিন্তু তাই বলে ধর্মনিরপেক্ষ যে ছিলেন তা মোটেই নয়। তিনিও চাইতেন রাষ্ট্রীয়ভাবে সব ধর্মের সমান মর্যাদা। ওই পর্যন্তই, তার বেশি নয়। সর্বোপরি তিনি রামরাজ্যের কথা বলতেন। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের লালনটা ছিল সমাজবিপ্লবের সম্ভাবনাকে ঠেকিয়ে রাখার অপ্রত্যক্ষ চেষ্টা। ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন না-করার যে নীতিকে তিনি প্রশ্রয় দিয়েছেন, রাজনীতির সে ধারারই চরমপন্থী পথিক হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। দেশভাগের সময় গান্ধীজি বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের রক্ষা করার চেষ্টা করছেন দেখতে পেয়ে আরএসএস ‌ক্ষিপ্ত হয়েছে। এবং গান্ধীজিকে হত্যা করতে তাদের হাত কাঁপেনি। গান্ধী-হত্যার নায়ক ওই আরএসএস এখন বিজেপির অন্তরঙ্গ সঙ্গী। গান্ধীজিকে বলা হতো জাতির পিতা। জাতির পিতা দুবার পরাজিত হয়েছেন। একবার সাতচল্লিশে, দেশভাগের সময়ে। পরাজিত হয়ে সেবার তিনি প্রাণ দিলেন। তারপর স্বাধীন ভারতে বিজেপির শাসনে তাঁর দ্বিতীয় পরাজয় ঘটল, আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী আদর্শের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে। উল্টো দিকের যে পথটি চলে গেছে সমাজবিপ্লবের দিকে, সে পথে তিনি যাননি, কংগ্রেসকেও যেতে সাহায্য করেননি। বরং ঠেকিয়ে রেখেছেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here